প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে কেন চিন্তিত হওয়া প্রয়োজন?

আমাদের প্রতিদিনকার ব্যবহার্য জিনিসপত্রের তালিকায় প্লাস্টিক একটি মূখ্য উপাদান। ভিন্ন ভিন্ন চেহারায়, ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োজনে প্লাস্টিক আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রয়োজনে প্লাস্টিক একটি সহজলভ্য, স্বল্পমূল্যের একটি উপকারি বস্তু। কিন্তু প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়া প্লাস্টিক যখন আমরা অজ্ঞতাবশতঃ ছুঁড়ে দেই প্রকৃতি ও পরিবেশের কোলে, তখন সেটির অস্তিত্ব আমাদের জন্য অপরিসীম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সারাবিশ্ব জুড়েই প্লাস্টিক দূষণ এ গ্রহের পরিবেশের জন্য এক ভয়াবহ হুমকির নাম।

 

প্লাস্টিক ও এর বিস্তৃতি

শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ “প্লাস্টিকোস” এবং “প্লাস্টোস” থেকে; যা দাঁড়া বোঝায় এমন বস্তুকে যাকে ছাঁচে ফেলে বিভিন্ন রূপ দেয়া সম্ভব। রাসায়নিক দিক থেকে প্লাস্টিক হলো পলিমার। পলিমার হল এমন উপাদান যা মনোমার নামক আণবিক এককের বহুগুণ পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে তৈরি হয়। হাইড্রোজেন ও কার্বনের তৈরি মনোমার তথা হাইড্রোকার্বন লম্বা রাসায়নিক শেকলে যুক্ত হয়ে পলিমার গঠণ করে।

প্লাস্টিক হলো বহুমুখী ব্যবহারসম্পন্ন, ওজনে হালকা, জল নিরোধক, দীর্ঘস্থায়ী এবং টেকসই একটি উপাদান যা বর্তমান বিশ্বে মানবজীবনের অত্যন্ত অপরিহার্য একটি সহায়িকা। খাদ্য ও পানীয় প্যাকেটজাতকরণ থেকে শুরু করে সিংহভাগ নিত্যব্যবহার্য ব্যাগ, ঠোঙা, পাত্র হিসেবেই এর ব্যবহার হয়।

 

প্লাস্টিক দূষণ

একেবারে পঁচে গিয়ে বিলীন হয়ে যেতে প্লাস্টিকের কেমন সময় লাগে তা কেউই আসলে নির্ভুলভাবে বলতে পারেন না। মোটামুটিভাবে ধরা যায় যে এটি হতে প্রায় হাজার হাজার বছর লেগে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়া হতে হতে নানান উপায়ে প্লাস্টিকের কারণে দূষিত হয় আমাদের পরিবেশ। সূর্য দ্বারা প্লাস্টিকের “ফটো-ডিকম্পোজিসন” প্রক্রিয়ায় নির্গত বিষাক্ত উপাদান মাটি, পানি এবং বায়ূকে দূষিত করে। সমুদ্র থেকে শুরু করে যেকোন আকারের জলাধারে অর্থাৎ পানিতে প্লাস্টিকের উপস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে জ্বলজ উদ্ভিদ এবং প্রাণীকূলকে। দীর্ঘসময়ে এই দূষণ ধ্বংস করে ফেলে জীববৈচিত্র এবং জীবের প্রাকৃতিক আবাসকে।

 

বর্জ্য হিসেবে প্লাস্টিক

গবেষণায় দেখা গেছে যে, ২০১৫ সাল নাগাদ পৃথিবীতে উৎপন্ন প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন মেট্রিক টন। যার মাঝে মাত্র ৯ শতাংশকে ‘রিসাইক্লিং’ অর্থাৎ পুনরায় ব্যবহার করা হয়েছে, ভস্মীভূত করা হয়েছে প্রায় ১২ শতাংশকে। আর বাকী প্রায় ৭৯ শতাংশই রয়ে গেছে উন্মুক্ত পরিবেশে মাটি ও পানির মাঝে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ প্রায় ১২ বিলিয়ন মেট্রিক টন প্লাস্টিক বিক্ষিপ্ত হতে থাকবে প্রকৃতিতে এবং দূষিত করতে থাকবে পরিবেশকে।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের এই ছোট ভিডিওক্লিপে দেখা যাচ্ছে সমুদ্রের নিচে কীভাবে জমা হচ্ছে প্লাস্টিক বর্জ্যসমূহ:

 

 

৩ ধরণের গন্তব্যে যায় আমাদের ফেলা প্লাস্টিক

১। ভাগাড়ের আবর্জনার স্তুপে: এক অংশ প্লাস্টিক সাধারণ আবর্জনার সাথে মিশে গেলে সেটির গন্তব্য হয় ময়লার ভাগাড়ে। সব শহরের মত ঢাকার আশেপাশেও রয়েছে বেশকিছু ময়লার ভাগাড় যেখানে বড় বড় গাড়ি ভরে ভরে আবর্জনা নিয়ে গিয়ে স্তুপ করে রাখা হয়। সেখানে খাদ্যের বর্জ্য, মেডিকেল বর্জ্য ইত্যাদির সাথে প্লাস্টিক বর্জ্যও মিশে একাকার হয়ে পড়ে থাকে। এরপর বাতাস, বৃষ্টি ও রোদে ধীরে ধীরে দূষিত হয়ে বিষাক্ত উপাদান নিঃসরণ করতে থাকে ঐসকল প্লাস্টিক। যা পরিবেশ তথা সকল জীবিত প্রাণকে ফেলে ভয়ানক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।

২। জলাশয় থেকে সমুদ্দূরে: কিছু কিছু বর্জ্য মেশে জলাশয়ে। এর মাঝে কিছু আছে যা নদীর পানিতে গিয়ে পড়ে। এগুলোর মধ্যে একটি বড় অংশ স্রোতের সাথে ভাসতে ভাসতে একসময় গিয়ে পৌঁছায় সমুদ্রে। পৃথিবীতে সবকটি সমুদ্রেই তৈরি হয়েছে ভাসমান ও ডুবন্ত আবর্জনার স্তুপ। বেশকিছু সামুদ্রিক প্রাণী ক্ষুধা পেলে না বুঝে সরাসরি প্লাস্টিক বর্জ্য খেয়ে মারা পড়ে অকালে। ক্ষুদ্র প্রাণী বা উদ্ভিদরাও যদি প্লাস্টিকের গুড়া কিংবা প্লাস্টিক নির্গত বিষাক্ত উপাদান দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকে তা খাদ্যশেকল বা ‘ফুড চেইন’ অবলম্বন করে একসময় আক্রান্ত করে বড় বড় মাছেদেরকেও। পুষ্টি ও স্বাদের লোভে মাছ খেতে গিয়ে সেই বিষাক্ত উপাদান একসময় চলে আসে আমাদের খাবারের প্লেটে এবং সবশেষে আমাদের পেটে।

৩। পুনঃরায় ব্যবহার বা ‘রিসাইকেল’: একটা ছোট অংশকে আমরা পুনঃরায় ব্যবহার করতে সক্ষম হই। সেগুলোকে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পুড়িয়ে, গলিয়ে রূপ দেয়া হয় গোলাকার ছোট ছোট প্লাস্টিকের টুকরাতে। সেগুলোকে আবার নতুনভাবে যেকোন জিনিস তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব হয়। এ পদ্ধতিতে দূষণ এড়িয়ে ফেলে দেয়া প্লাস্টিককে আবার ব্যবহারযোগ্য বস্তুতে রূপ দেয়া হয়ে থাকে।

নিচের ছোট অ্যানিমেশনে পুরো ব্যাপারটি অনেক সহজভাবে দেখানো হয়েছে:

 

 

0 Comments

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

© 2017 Waste Free Bangladesh

Log in with your credentials

Forgot your details?